আজকের পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের জন্ম হওয়ার কোটি কোটি বছর আগে, এমনকি পৃথিবীর বুকে আজকের মহাদেশগুলির সৃষ্টি হওয়ারও আগে, এই পৃথিবীতে পুরুলিয়ার অস্তিত্ব ছিল।

ইতিহাসের বইগুলি সাধারণত মিশরের পিরামিড বা রোমের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে মেতে থাকে, কিন্তু তারা সম্পূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক সত্যকে এড়িয়ে যায়: পুরুলিয়া দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং পৃথিবীর আদিমতম ভূত্বকের ওপর। এটি কেবল লাল মাটি আর পলাশ ফুলের জেলা নয়; এটি আমাদের এই গ্রহের জন্মলগ্নের এক জীবন্ত দলিল। [1, 2, 3]

প্রথম অঙ্ক: আদিম পৃথিবী ও মহাদেশীয় ভাঙন (৩.৬ বিলিয়ন থেকে ১৪ কোটি বছর আগে)

প্রথম পর্ব: পৃথিবীর বুকে প্রথম সমুদ্র সৈকত (৩.৬ বিলিয়ন বছর আগে)

कल्पना করুন একটি জ্বলন্ত গ্রহের কথা, যা সম্পূর্ণভাবে ফুটন্ত বিষাক্ত মহাসমুদ্রে ঢাকা। সেখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। আচমকা, টেকটনিক পাতের প্রবল চাপে এক বিশাল গ্রানাইট ও নিস শিলার খণ্ড সেই আদিম সমুদ্রের বুক চিরে ওপরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। [1, 2, 3]

এটিই ছিল শিংভূম ক্রাটন, যা আজকের পুরুলিয়ার মূল ভিত্তিভূমি। আন্তর্জাতিক স্তরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থা Nature Geoscience-এর জার্নাল-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই পাতের প্রাচীন পাথরেই পৃথিবীর প্রথম ঢেউয়ের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। অর্থাৎ, এটিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সমুদ্রের ওপর জেগে ওঠা আদিমতম শুষ্ক ভূখণ্ড বা প্রথম সমুদ্র সৈকত। [1]

পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন ভূখণ্ডের তুলনায় পুরুলিয়া কতখানি প্রাচীন, তা নিচের সারণীটি দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে:

ক্রাটন বা মহাদেশীয় পাত (Craton)বর্তমান ভৌগোলিক অবস্থানআনুমানিক বয়স (বিলিয়ন বছর)বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য
শিংভূম ক্রাটন (পুরুলিয়া)ভারত৩.৫ থেকে ৩.৬পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সমুদ্রের ওপর জেগে ওঠা শুষ্ক মাটি।
পিলবারা ক্রাটন (Pilbara)পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া৩.৫ থেকে ৩.৬শিংভূম ক্রাটনের সমসাময়িক এবং একই শিলা দ্বারা গঠিত।
বারবারটন ক্রাটন (Barberton)দক্ষিণ আফ্রিকা৩.৩ থেকে ৩.৫আদিমতম আগ্নেয় শিলার স্তর।
স্লেভ ক্রাটন (Slave Craton)কানাডা৩.২ থেকে ৪.০ভূগর্ভস্থ রূপান্তরিত শিলাখণ্ড।
বাল্টিক শিল্ড (Baltic Shield)স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও রাশিয়া২.৭ থেকে ৩.১ইউরোপের অনেক পরে তৈরি হওয়া ভূত্বক।

আজ যখন কোনো পর্যটক পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় বা জয়চণ্ডী পাহাড়ে ট্র্যাকিং করেন, তারা আসলে কোনো সাধারণ পাহাড়ে হাঁটেন না; তারা পা রাখেন প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি বছরের পুরোনো পৃথিবীর সেই আদিমতম স্তম্ভে, যা আমেরিকা বা ইউরোপ মহাদেশ তৈরি হওয়ার বহু আগে থেকেই এই গ্রহে অবিচল দাঁড়িয়ে রয়েছে। [1]

দ্বিতীয় পর্ব: গন্ডোয়ানা সংযোগ ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে মেলবন্ধন (১৪ কোটি বছর আগে)

ভূতাত্ত্বিক বা জিওলজিক্যাল গবেষণার এক অবিশ্বাস্য তথ্য অনুযায়ী, পুরুলিয়ার কংসাবতী, কুমারী বা সুবর্ণরেখা নদীর তলদেশে বা মাটির নিচে যে শক্ত প্রাচীন পাথর দেখা যায়, তার সাথে সুদূর অস্ট্রেলিয়ার মাটির নিচের পাথরের হুবহু মিল রয়েছে।

আজ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ৫০ কোটি বছর আগে আজকের ভারত ও অস্ট্রেলিয়া আলাদা কোনো মহাদেশ ছিল না; এরা ‘গন্ডোয়ানা’ (Gondwanaland) নামক এক বিশাল সুপারমহাদেশের অংশ হিসেবে একে অপরের সাথে সরাসরি জোড়া লেগে ছিল। পুরুলিয়ার মূল ভিত্তিভূমি, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ছোটনাগপুর গ্রানাইট নাইস কমপ্লেক্স’ (CGC) বলা হয়, এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন ‘ক্রাটন’ অঞ্চল একই সময়ে সমসাময়িক খনিজ উপাদান (যেমন কোয়ার্টজ, মাইকা ও ফেল্ডস্পার) নিয়ে গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রায় ১৪ কোটি বছর আগে মহাদেশীয় ভাঙনের (Continental Rifting) ফলে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া আলাদা হয়ে দুরকম ভিন্ন দিকে ভেসে যায়। কিন্তু আজ মহাদেশগুলো হাজার হাজার মাইল দূরে সরে গেলেও, নদীর তলদেশের সেই আদিম পাথরের রাসায়নিক “ডিএনএ” বা গঠন আজ দুই প্রান্তেই হুবহু একই রয়ে গেছে। [11]

দ্বিতীয় অঙ্ক: প্রাগৈতিহাসিক ও পৌরাণিক কাল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪,০০০ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ)

প্রথম পর্ব: বরফ যুগের গুহামানুষ (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪,০০০ অব্দ)

সময় গড়িয়ে চলল। পৃথিবী ধীরে ধীরে ঠান্ডা হলো এবং একসময় বরফ যুগ (Ice Age) পুরো গ্রহকে গ্রাস করল। যখন উত্তর গোলার্ধ বরফের চাদরে ঢাকা, তখন একদল আদিম মানুষ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল পুরুলিয়ার এই শক্ত পাথুরে পাহাড়ের খাঁজে। [1]

বহু বছর ধরে এটি কেবল একটি লোককথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (Directorate of Archaeology)-এর সাম্প্রতিক খননকার্যে পুরুলিয়ার মহাদেববেড়া এবং কানা পাহাড়ের পাদদেশে মাটির নিচে কোয়ার্টজایت পাথরের তৈরি ছোট আদিম অস্ত্র (Microliths) আবিষ্কৃত হয়েছে। ওএসএল (OSL Dating) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে এই অস্ত্রগুলি ৩৪,০০০ বছর প্রাচীন। এই আবিষ্কার পুরুলিয়াকে পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও অবিচ্ছিন্ন মানব বসতির মর্যাদা দিয়েছে। [3]

দ্বিতীয় পর্ব: ত্রেতা যুগের রামায়ণ-যোগ ও ‘সীতাকুণ্ড’ (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ – ১৫০০ অব্দ)

লোকবিশ্বাস ও মহাকাব্যের পাতা উল্টলে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় এক অলৌকিক রূপ ধারণ করে। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, ১৪ বছরের বনবাসের সময় শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষণ এবং মাতা সীতা এই পাহাড়ের গভীর জঙ্গলেই বেশ কিছুদিন আশ্রয় নিয়েছিলেন।

একদিন তীব্র গরমে সীতা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে আশেপাশে কোনো জল পাওয়া যায়নি। তখন শ্রীরামচন্দ্র তাঁর ধনুক থেকে এক অব্যর্থ তির নিক্ষেপ করেন মাটির বুকে, আর সঙ্গে সঙ্গে পাথর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে ভূগর্ভস্থ জলের ফোয়ারা। সেই জায়গাটিই আজ ‘সীতাকুণ্ড’ নামে পরিচিত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পাহাড়ের ওপরে হওয়া সত্ত্বেও এই কুণ্ডের জল আজও কখনো শুকায় না। [7]

তৃতীয় পর্ব: মানবাজারের রহস্যময় ‘পাথুরে সমাধি’ বা মেগালিথ (খ্রিষ্টপূর্ব ১,২০০ – ৩০০ অব্দ)

পুরুলিয়ার ইতিহাস কোনো সাধারণ পাথরের গল্প নয়। জেলার মানবাজার, বান্দোয়ান এবং বরাবাজার অঞ্চলের খোলা মাঠে বা মাটির নিচে তাকালে দেখা যায় বিশালাকার সব খাড়া পাথর, বৈজ্ঞানিক ভাষায় যাদের বলা হয় ‘Megaliths’ বা ‘Menhirs’

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এগুলো ছিল হাজার হাজার বছর আগের আদিম মানুষদের সমাধি ক্ষেত্র বা বিশেষ গোত্রের স্মৃতিস্তম্ভ। এই পাথরের নিচ থেকে লোহা গলানোর প্রাচীন অবশেষ ও মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে আজ থেকে প্রায় ৩,০০০ বছর আগে লৌহ যুগেও (Iron Age) পুরুলিয়ার বুকে এক উন্নত ও রহস্যময় আদিবাসী সংস্কৃতি মাথা চড়া দিয়েছিল। [6]

তৃতীয় অঙ্ক: প্রাচীন সাম্রাজ্য ও বাণিজ্য পথের যুগ (খ্রিস্টীয় ১ম – ৭ম শতাব্দী)

প্রথম পর্ব: গড় পঞ্চকোটের গোড়াপত্তন (খ্রিষ্টীয় ৯০ অব্দ)

পুরুলিয়ার সুউচ্চ পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘গড় পঞ্চকোট’ একসময় ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য রাজ্য। আনুমানিক ৯০ খ্রিষ্টাব্দে রাজা দামোদর শেখর দ্বারা এই ‘শিখর রাজবংশ’-এর প্রতিষ্ঠা হয়। সুরক্ষার জন্য পাহাড়ের চারপাশে পাঁচটি বিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীর বা দুর্গ তৈরি করা হয়েছিল বলেই এর নাম হয় ‘পঞ্চকোট’। শত্রুপক্ষকে আটকাতে রাজারা পাহাড়ের চারপাশে এক গভীর পরিখা খনন করে তাতে হিংস্র কুমির ছেড়ে রাখতেন, যা এই অঞ্চলের প্রাচীন সামরিক দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন। [12]

দ্বিতীয় পর্ব: গুপ্ত ও শশাঙ্ক আমল এবং ‘তাম্রলিপ্ত’ বাণিজ্য পথ (৪র্থ – ৭ম শতাব্দী)

সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত বা গৌড়রাজ শশাঙ্কের আমলে পুরুলিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন জঙ্গল ছিল না; এটি ছিল ভারতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ (Trade Route)। মগধ (আজকের বিহার) এবং ওড়িশার বণিকেরা সেই আমলের বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর ‘তাম্রলিপ্ত’ (আজকের তমলুক)-এ যাতায়াতের জন্য পুরুলিয়ার ওপরের পথটিই ব্যবহার করতেন। এই বাণিজ্য পথের হাত ধরেই সুবর্ণরেখা ও কংসাবতী নদীর অববাহিকায় চেলিয়ামা, বুধপুর ও ক্রোমরার মতো প্রাচীন জনপদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলি গড়ে উঠেছিল। [8]

চতুর্থ অঙ্ক: জৈন সন্ন্যাসী ও পাল-সেন যুগের স্বর্ণযুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী – ১৩শ শতাব্দী)

প্রথম পর্ব: বজ্রভূমি ও মহাবীরের আগমন

যুগের পর যুগ ধরে পুরুলিয়ার এই দুর্গম, ঘন জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলের নাম প্রাচীন জৈন গ্রন্থ ‘ভগবতী সূত্র’-এ পাওয়া যায় ‘বজ্রভূমি’ বা বজ্রের দেশ নামে। পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট-এর তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলটি এতটাই রুক্ষ ও বন্য ছিল যে, ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর স্বয়ং নিজের আধ্যাত্মিক সাধনার পরীক্ষা নিতে এই পথেই ভ্রমণ করেছিলেন। [2]

দ্বিতীয় পর্ব: দেউলঘাটার ‘পোড়া ইটের বিস্ময়’ (৮ম – ১২শ শতাব্দী)

জয়পুর ব্লকের কংসাবতী নদীর তীরে অবস্থিত দেউলঘাটা প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যের এক পরম বিস্ময়। এখানে মূলত পোড়া ছোট ছোট ইট দিয়ে সুউচ্চ ‘রেখ দেউল’ মন্দির নির্মিত হয়েছিল, যার গায়ে ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম চুন-বালির পলস্তরা (Stucco decoration) এবং টেরাকোটার দেবদেবী।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন যখন দেউলঘাটা পরিদর্শনে আসেন, তিনি এখানকার কারুকার্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯১১ সালের ‘Manbhum District Gazetteer’-এ এই দেউলকে ওড়িশার ভুবনেশ্বরের মন্দিরের সমকক্ষ এবং বাংলার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে উল্লেখ করা হয়। [9]

তৃতীয় পর্ব: ‘তেলকুপি’র রাজা রুদ্রশিখর ও রামচরিতম (১১শ শতাব্দী)

দামোদর নদের তীরে অবস্থিত আজকের তেলকুপি (প্রাচীন নাম তৈলকম্পী) ১৯৫৭ সালে পাঞ্চেত বাঁধের নিচে তলিয়ে গিয়ে আজ ‘বাংলার হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস’ নামে পরিচিত। কিন্তু একাদশ শতাব্দীতে এটি ছিল শিখর রাজবংশের রাজা রুদ্রশিখরের এক শক্তিশালী রাজধানী।

সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রামচরিতম’-এ উল্লেখ রয়েছে, উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত কৈবর্ত বিদ্রোহ দমন করার জন্য পাল বংশের রাজা রামপালকে এক বিশাল চতুরঙ্গ সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলেন এই তেলকুপির রাজাই। অর্থাৎ, সে যুগে বাংলার কেন্দ্রীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখত পুরুলিয়া। [1, 10]

Structural Marvel: বান্দার দেউল ও পাকবিড়রার পাথুরে দৈত্য (১১শ শতাব্দী)

রঘুনাথপুর-২ ব্লকের বান্দা গ্রামে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক জাদুকরি স্থাপত্য, যা বর্তমানে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত একটি জাতীয় স্মারক। এই সুউচ্চ রেখ দেউলটি সম্পূর্ণভাবে শক্ত কোয়ার্টজایت পাথর কেটে ওড়িশার কলিঙ্গ শৈলীতে তৈরি। সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, এই বিশাল মন্দিরটি তৈরিতে কোনো চুন-সুরকি বা কাদা ব্যবহার করা হয়নি! কেবল নিখুঁত ইন্টারলকিং পদ্ধতিতে একটার ওপর একটা পাথর খাঁজ কেটে বসিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছিল। [13]

এর পাশাপাশি, পাকবিড়রায় আজও খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে জৈন তীর্থঙ্কর পদ্মপ্রভুর এক বিশালাকায় সাড়ে ৭ ফুটের পাথরের মূর্তি, যা একসময়ে পুরুলিয়ার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির নীরব সাক্ষী। [1]

পঞ্চম অঙ্ক: মধ্যযুগ, বর্গী হানা ও মল্লভূম সংযোগ (১৬৯৭ – ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দ)

প্রথম পর্ব: চেলিয়ামার রাধাবিনোদ মন্দির ও মল্লভূম সংযোগ (১৬৯৭ খ্রিষ্টাব্দ)

পুরুলিয়া মূলত পাথরের দেউলের জন্য পরিচিত হলেও এর বুকেই লুকিয়ে আছে পোড়ামাটি বা টেরাকোটার এক অনবদ্য মাস্টারপিস। রঘুনাথপুর-২ ব্লকের চেলিয়ামা গ্রামে ১৬৯৭ সালে তৈরি হয় এই রাধাবিনোদ মন্দির। মন্দিরের প্রবেশদ্বার এবং দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণের রাসলীলা এবং তৎকালীন রাজাদের শিকারের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা বাঁকুড়া বা হুগলির বিখ্যাত টেরাকোটা মন্দিরগুলোর সাথে অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে। [15]

দ্বিতীয় পর্ব: বর্গী আক্রমণের নৃশংস ধ্বংসলীলা (১৭৪০-এর দশক)

গড় পঞ্চকোটের শতাব্দীর দীর্ঘ গৌরবের ইতিহাস থমকে যায় ১৭৪০-এর দশকে। মারাঠা ‘বর্গী’ সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে এক নৃশংস বাহিনী একটি গোপন পথ দিয়ে এই দুর্গে হানা দেয়। তারা নির্বিচারে রাজপরিবারের সৈন্য ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করে এবং প্রাসাদ লুণ্ঠন করে আগুন লাগিয়ে দেয়।

লোককথা অনুযায়ী, রাজবাড়ির নারীরা নিজেদের সম্মান বাঁচাতে দুর্গের ভেতরের কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। এই ভয়ংকর গণহত্যার পরই তৎকালীন রাজা গড় পঞ্চকোট চিরতরে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। [12]

তৃতীয় পর্ব: কাশীপুর রাজবাড়ির পত্তন (১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দ)

বর্গী আক্রমণের পর পঞ্চকোটের রাজপরিবার সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় জঙ্গলমহল থেকে পালিয়ে আসে এবং ১৭৫২ সালে পুরুলিয়ার কাশীপুরে নতুন রাজধানী পত্তন করে। এখানে ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যের মিশ্রণে এক দৃষ্টিনন্দন রাজপ্রাসাদ গড়ে তোলা হয়, যা আজ ‘কাশীপুর রাজবাড়ি’ নামে বিখ্যাত। [14]

ষষ্ঠ অঙ্ক: লাল মাটির বিদ্রোহ ও ব্রিটিশ শাসন (১৭৬৫ – ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ)

১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলার দেওয়ানি লাভ করে, তারা ভেবেছিল পুরুলিয়াকে সহজে দমন করা যাবে। কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিল। পুরুলিয়ার স্বাধীনচেতা সাঁওতাল, ভূমিজ ও কুড়মি সম্প্রদায় কখনোই ব্রিটিশদের শাসন মেনে নেয়নি।

  • চোয়াড় বা চিলকা আন্দোলন (১৭৬৯): ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার বুকে প্রথম সশস্ত্র আদিবাসী বিদ্রোহ।
  • মহাবীর রঘুনাথ সিং এবং ভারতের প্রথম ‘গেরিলা যুদ্ধ’ (১৭৯৮ – ১৭৯৯): ১৭৯৮ সালের বিখ্যাত চোয়াড় বিদ্রোহের প্রধান নায়ক ছিলেন পুরুলিয়ার দামপাড়ার জমিদার রঘুনাথ সিং। তিনিই প্রথম এই অঞ্চলের দুর্গম পাহাড় আর ঘন শাল জঙ্গলকে প্রাকৃতিক ঢাল বানিয়ে ব্রিটিশদের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘গেরিলা যুদ্ধ’ বা অতর্কিত আক্রমণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তাঁর রণকৌশলের ভয়ে ব্রিটিশ সাহেবরা পুরুলিয়ার জঙ্গলে ঢুকতে কাঁপত। [16]
  • ভূমিজ বিদ্রোহ (১৮৩২): গঙ্গানারায়ণ সিংহের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ এতটাই ভয়ংকর ছিল যে ব্রিটিশরা পুরো ‘জঙ্গল মহল’ জেলা ভেঙে ১৮৩৩ সালে ‘মানভূম’ জেলা গঠন করতে বাধ্য হয় এবং ১৮৩৮ সালে পুরুলিয়া শহরে এর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়।
  • ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে রাজা নীলমণি সিং দেও-এর হুঙ্কার: আমরা জানি মঙ্গল পাণ্ডের হাত ধরে সিপাহি বিদ্রোহের আগুন জ্বলেছিল, কিন্তু পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলও ছিল এই বিদ্রোহের এক প্রধান বারুদখানা। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় রঘুনাথপুরের পঞ্চকোট রাজবাড়ির রাজা নীলমণি সিং দেও সরাসরি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি সাঁওতাল, কোল ও স্থানীয় আদিবাসীদের নিয়ে এক বিশাল বিদ্রোহী বাহিনী গড়ে তোলেন এবং রাঁচি-হজারীবাগ থেকে পালিয়ে আসা বিদ্রোহী সিপাহিদের পুরুলিয়ায় আশ্রয় দেন। পরে ব্রিটিশরা বিশাল ফৌজ পাঠিয়ে তাঁকে বন্দি করে কলকাতার আলিপুর জেলে পাঠায়। [17]

সপ্তম অঙ্ক: কাশীপুরের সাহিত্য অধ্যায় ও মাতৃভাষার রক্তক্ষয়ী লড়াই (১৮৭২ – ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)

প্রথম পর্ব: মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাশীপুর অধ্যায় (১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ)

কাশীপুর রাজবাড়িটি ছিল এই অঞ্চলের শিল্প ও সাহিত্যের মূল কেন্দ্র। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার প্রখ্যাত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর জীবনের চরম আর্থিক সংকটের সময়ে তৎকালীন রাজা নীলমণি সিং দেও-এর এস্টেটের লিগ্যাল অ্যাডভাইজর (আইনি উপদেষ্টা) এবং ম্যানেজার হিসেবে এখানে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি এই রাজবাড়ির বিশাল লাইব্রেরি ব্যবহার করে বেশ কিছু সাহিত্যচর্চাও করেছিলেন। [14]

আজ রাজতন্ত্র না থাকলেও প্রতি বছর দুর্গাপূজার সময় রাজপরিবারের প্রাচীন তরবারি, ঢাল ও রাজকীয় পোশাক বের করে এবং প্রাচীন প্রথা মেনে তোপ দেগে এখানে সন্ধিপূজা করা হয়।

দ্বিতীয় পর্ব: টুসু আন্দোলন ও মানভূমের ভাষা আন্দোলন (১৯১২ – ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)

পুরুলিয়ার ঘরের উৎসব ‘টুসু’র পেছনে লুকিয়ে আছে এক কান্নার এবং প্রতিবাদের ইতিহাস। লোককথা অনুযায়ী, টুসু ছিলেন এক রূপবতী কুড়মি কন্যা, যাঁর ওপর নজর দিয়েছিল এক অত্যাচারী সামন্ত রাজা। নিজের সম্মান বাঁচাতে টুসু নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সতীত্ব বিসর্জন দেন। সেই থেকে টুসু মানভূমের নারীদের কাছে বিদ্রোহের প্রতীক।

এই লোক উৎসবই আবার ১৯৫৬ সালের ঐতিহাসিক ‘মানভূম ভাষা আন্দোলন’-এর প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে যখন বাংলা থেকে বিহারকে আলাদা করা হয়, তখন ব্রিটিশরা অন্যায়ভাবে বাংলাভাষী এই মানভূম (আজকের পুরুলিয়া) জেলাটিকে বিহারের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, তৎকালীন বিহার সরকার জোর করে এই অঞ্চলের বাঙালিদের ওপর হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে মানভূমের মানুষ। ‘লোকсеবক সংঘের’ নেতৃত্বে হাজার হাজার সত্যাগ্রহী কোনো স্লোগান না দিয়ে, কেবল প্রতিবাদী টুসু গান গেয়ে পুলিশের লাঠি আর জেলের মুখোমুখি এসেছিলেন, “বাংলা ভাষা মোদের জন্ম অধিকার”। হাজার হাজার মানুষ পুরুলিয়া থেকে কলকাতা পর্যন্ত ৩০০ মাইল পথ খালি পায়ে হেঁটে ১৭ দিন ধরে পদযাত্রা করেন। এটি ছিল ভাষার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসের দীর্ঘতম ও সফলতম পদযাত্রা আন্দোলনগুলির একটি।

অবশেষে ভারত সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর, ‘রাজ্য পুনর্গঠন আইন’-এর মাধ্যমে মানভূম জেলা ভেঙে পুরুলিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। [4, 18]

অষ্টম অঙ্ক: বর্তমান ও পুনরুত্থান (১৯৫৭ – ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ)

কোটি কোটি বছরের ভৌগোলিক আলোড়ন, ঔপনিবেশিক শাসন এবং রাজনৈতিক বঞ্চনা সহ্য করার পর পুরুলিয়া নিজের পরিচয় নতুন করে গড়ে তুলেছে শিল্পের মাধ্যমে। এখানকার প্রাচীন রণকৌশল ও আদিবাসী সংস্কৃতি মিলে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত ‘ছৌ নাচ’ (Chhau Dance)। ইউনেস্কো (UNESCO)-এর অফিশিয়াল ঘোষণা অনুযায়ী, এই নাচকে বিশ্বের ‘অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। [5]

আজ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে এসে পুরুলিয়া এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক ও পর্যটন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে লাল মাটিতে একসময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রক্ত ঝরেছিল, আজ সেই মাটিতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসেন ছৌ নাচের ধামসা-মাদলের তালে মেতে উঠতে এবং বসন্তে পলাশের রক্তিম রূপ দেখতে।

পুরুলিয়া কেবল একটি জেলা বা ভ্রমণের জায়গা নয়। এটি সেই পবিত্র স্থান, যেখানে স্বয়ং এই পৃথিবী প্রথমবার সমুদ্রের বুক চিরে জেগে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [1, 2, 3]

 তথ্যসূত্র (References)

  1. Nature Geoscience Journal (2021): Research on the geological evolution of the Singhbhum Craton.
  2. Purulia District Official Website: Official government portal detailing historical sites and tourist information.
  3. West Bengal Tourism Dept: Official tourism portal of West Bengal.
  4. Anandabazar Patrika (Manbhum Language Movement): Historical context and archives regarding the Manbhum Language Movement.
  5. Purulia District Culture: Official information on the cultural heritage and Chhau dance of Purulia.
  6. Proceedings of the Prehistoric Society: Research on megalithic sites and ancient human settlements.
  7. Ethno-mythological Studies: Studies on the folklore and mythology of the Rarh Bengal region.
  8. Ancient Trade Routes: Studies on ancient trade networks and connectivity in Bengal.
  9. L.S.S. O’Malley (1911), Bengal District Gazetteers: Historical and administrative record of the Manbhum district (1911).
  10. Sandhyakar Nandi, Ramacharitam: An 11th-century epic poem by Sandhyakar Nandi, which mentions Telkupi.
  11. GSI & Elsevier – Lithological Correlation: Scientific analysis of geological rock layers and continental connections.
  12. ASI Reports – Garh Panchkot: Archaeological Survey of India (ASI) documentation on the Garh Panchkot fort.
  13. ASI – Banda Deul: Documentation on the architecture and preservation of the Banda Deul.
  14. Biographical Records – Michael Madhusudan Dutt: Records of Michael Madhusudan Dutt’s tenure as the manager of the Kashipur Estate.
  15. Terracotta Temples – West Bengal: Overview of the terracotta temple architecture of Bengal and its artistic evolution.
  16. Chuar Rebellion Records: British archival records regarding the Chuar Rebellion (1766–1834).
  17. Mutiny Records – Alipore Jail Archives: Documents regarding the 1857 Indian Mutiny and the imprisonment of freedom fighters.
  18. Manbhum Language Movement Report (1956): Detailed reports on the 1956 Manbhum Language Movement and Satyagraha.